সম্পাদকীয়

একজন রতন সেন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০ |

গৌরাঙ্গ নন্দী ■

সিপিবি নেতা কমরেড রতন সেন দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে ১৯৯২ সালের আজকের দিনে নিহত হন। তাঁর হত্যার ঘটনায় কাউকে শাস্তি দিতে পারেননি আদালত। তাঁর সহকর্মীরা আজও ভোলেননি তাঁকে। রতন সেন হত্যাকাণ্ড নিয়ে অপরাধনামার আজকের আয়োজন।

রতন সেনের পারিবারিক নাম ছিল সুনীল সেনগুপ্ত। বরিশালের এক মোটামুটি সচ্ছল পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৩ সালের ৩ এপ্রিল। বাবা নরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজে বাবার চাকরির সুবাদে তিনি এখানে আসেন। ১৯৩৮ সালে দৌলতপুর মহসিন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪২ সালে বিএল কলেজ থেকে ডিস্টিংকশনসহ বিএ পাস করেন। স্কুলের ছাত্রাবস্থায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। সেই থেকে রাজনীতিই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। পারিবারিক সদস্য_ব্যক্তি সুনীল সেনগুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমেই রতন সেন হয়ে সমাজের কাছে দায়বদ্ধ এক ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯৪৭-পরবর্তীকালের এ বাংলা ছেড়ে তাঁর পরিবারের অপরাপর সদস্য ভারতে চলে গেলেও তিনি একাই থেকে যান। বিয়েও করেননি তিনি। '৪৭ থেকে '৭১_এই ২৪ বছরের ১৭ বছরই রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে কাটিয়েছেন। দলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বটিয়াঘাটার বয়ারভাঙ্গা স্কুলে ও তেরোখাদার আজগড়া স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। লিখেছেন অসংখ্য রাজনৈতিক-সামাজিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে তাঁর রাজনৈতিক দলকে একটি গণভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। খুলনা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবেননি। এক পর্যায়ে তাঁকে দেশের কেন্দ্র রাজধানী ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলেও তিনি সেখানে বেশি দিন থাকেননি।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষা-সংস্কৃতি বিনিময় চুক্তি ছিল। সেই চুক্তির আওতায় খুলনা ও আশপাশের অঞ্চলের অনেকেই রতন সেনের সুপারিশ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই খুলনা শহরে আজ প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে রতন সেনের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। তিনি রূপসার পালের হাটের বাজারের কাছে যে বাড়িতে থাকতেন, এর আশপাশের অনেককে তিনি ছোটখাটো ব্যবসা করার জন্য সহযোগিতা করেছেন। অনেককে রিকশা-ভ্যান কিনে দিয়েছেন। যাদের রিকশা-ভ্যান দিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে একটিই কথা ছিল_তারা তাঁকে (রতন সেন) নদীর ঘাট থেকে আনা-নেওয়া করবে; আর যারা শহরে রিকশা চালায়, তারা প্রয়োজনে তাঁকে (রতন সেন) এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে।

১৯৪৮ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁকে রাখা হয় রাজশাহী কারাগারের বহুল আলোচিত খাপড়া ওয়ার্ডে। রাজশাহী জেলে সে সময় ছিলেন কিংবদন্তি নারী নেত্রী সাঁওতালদের রানিমা ইলা মিত্র। পরবর্তী সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুসহ আরো অনেকে।

যশোর-খুলনা যুবসংঘের নেতৃস্থানীয় কর্মী বড় ভাই মোহিত সেনগুপ্তের হাত ধরে রতন সেনের রাজনৈতিক জীবন শুরু। স্কুলজীবনে প্রথমে যুক্ত হন নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতিতে। পরবর্তী সময়ে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রদের সংগঠন ছাত্র ফেডারেশন গঠিত হলে তিনি তাতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন বিএল কলেজের অন্যতম ছাত্রনেতা। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সংস্পর্শে এসে তিনি মার্কসবাদের অনুসারী হন। ১৯৪২ সালের আগস্টে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। প্রথমে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন। পরে ১৯৪৫ সালে পার্টির নির্দেশনায় খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বয়ারভাঙ্গা বিশ্বেম্বর হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামের কৃষকদের সংগঠিত করা।

রতন সেন গ্রেপ্তার হন ১৯৪৮ সালে। যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি ছাড়া পান। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি বটিয়াঘাটায় না গিয়ে রূপসার মৈশাগুনি গ্রামে জেলসাথী শান্তি ঘোষের বাড়িতে যান। পার্টি তখনো নিষিদ্ধ থাকায় তিনি আজগড়া স্কুলে শিক্ষকতা করতেন আর আশপাশের গ্রামে সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করতেন। ১৯৬৯ সালে জেলমুক্ত হওয়ার পর দেখেন কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত। এক শিবির চীনাপন্থী এবং আরেক শিবির মস্কোপন্থী নামে পরিচিত হয়। যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল তাই রাজনৈতিক বিরোধের প্রকাশ ঘটেছিল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির মাধ্যমে। ছাত্র ইউনিয়নের তখন দুই তুখোড় নেতা রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরী, যাঁদের পরিচিতি ছিল মেনন ও মতিয়া গ্রুপ নামে। মেনন গ্রুপ ছিল পিকিংপন্থী আর মতিয়া গ্রুপ ছিল মস্কোপন্থী।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার কাজে মনোযোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং সাবেক ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী বাহিনীর মধ্যে তাঁর আস্থাভাজনদের দিয়ে তিনি খুলনায় পার্টি (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি) গঠনে মনোনিবেশ করেন। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন গণসংগঠন গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেন।

তিনি সিপিবির খুলনা জেলা শাখার সম্পাদক, সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখে তিনি সামান্য হলেও কিছু টাকা আয় করতেন, সিপিবি কর্মী অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ বলেন, তাও তিনি দলীয় ফান্ডে দিয়ে দিতেন। কারণ তিনি বলতেন, 'রতন সেনের মেধা দলের মেধা, ফলে রতন সেনের যেকোনো আয় দলের আয়।'

তাঁর ভাইপো আমেরিকায় বড় চাকরি করার সুবাদে কাকাকে মাঝেমধ্যে ডলার পাঠাতেন। সে অর্থও তিনি দলীয় তহবিলে জমা দিয়েছেন। কখনোই ব্যক্তিগত প্রয়োজন কিছু আছে বলে মনে করেননি। তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনীতির সঙ্গী-অনুসারী সিপিবি খুলনা জেলা শাখার সভাপতি মনিরুজ্জামান বলেন, 'রতন সেন একেবারেই সামাজিক মালিকানাবোধের একজন সার্থক প্রতিবিম্ব। তাঁর ভাইপো একেবারে তাঁর প্রয়োজনে চিকিৎসার জন্য যে টাকা তাঁকে পাঠাত, সেটাকেও তিনি দলীয় সম্পদ বিবেচনা করে দলের প্রয়োজনে ব্যয় করতেন।' আমরা অনেক সময় আপত্তি করেছি। তিনি বলেছেন, 'ব্যক্তি রতন সেনের কোনো অস্তিত্ব নেই। রতন সেনের ব্যক্তিগত প্রয়োজন নেই। ফলে এ সম্পদ পার্টিরই।'