মুজিব শতবর্ষ

ক্রীড়ায় অনন্য বঙ্গবন্ধু

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারী ২০২০ |

ক্রীড়া প্রতিবেদক ■ বাংলাদেশ প্রেস

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ ব্যক্তি। স্কুল জীবনে ফুটবল, ভলিবল, হকি খেলোয়াড় ছিলেন। হার্টের ব্যারাম থাকা সত্ত্বেও খেলা ত্যাগ করেননি। ’৪০-এর দশকে ঢাকা ওয়ান্ডরার্সের হয়ে খেলেছেন ফুটবল। দেশের ক্রীড়াঙ্গণের প্রতিও তাঁর ছিল তীব্র অনুরাগ।

বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াকে ভালোবেসে গেছেন আমৃত্যু। বাংলাদেশের দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ক্রীড়াঙ্গনে গড়ে তুলেন বিভিন্ন ফেডারেশন। ’৭২ সালে গঠন করেন বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড। একই বছর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যা বর্তমানে এনএসসি নামে পরিচিত।

সব সময় খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণীত করে গেছেন বঙ্গবন্ধু। বিদেশে কোন টুর্নামেন্টে খেলতে যাওয়ার আগে খেলোয়াড়দের বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল বাধ্যতামূলক। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২'র ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গন্ধুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। মাঠে বসে সেই খেলাটি উপভোগ করেছিলেন তিনি।

খেলার প্রতি যে টান ছিল তা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর নিজের লেখাতে। নিজের ডায়রিতে পর্যন্ত লিখেছেন খেলা সম্পর্কে। যা পরবর্তীতে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে প্রকাশ পেয়েছে। এবার পাঠকদের উদ্দেশে সেই গ্রন্থ থেকে বঙ্গবন্ধুর লেখা তুলে ধরা হলো-

আমি খেলাধুলাও করতাম। ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলাতম। খুব ভাল খেলোয়াড় ছিলাম না, তবুও স্কুলের টিমের মধ্যে ভাল অবস্থান ছিল। এই সময় আমার রাজনীতির খেয়াল তত ছিল না।

খেলাধুলার দিকে আমার খুব ঝোঁক ছিল। আব্বা আমাকে বেশি খেলতে দিতে চাইতেন না। কারণ আমার হার্টের ব্যারাম হয়েছিল। আমার আব্বাও ভাল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। আর আমি মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। আব্বার টিম ও আমার টিমে যখন খেলা হত তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত। আমাদের স্কুল টিম খুব ভাল ছিল। মহকুমায় যারা ভাল খেলোয়াড় ছিল, তাদের এনে ভর্তি করতাম এবং বেতন ফ্রি করে দিতাম।

১৯৪০ সালে আব্বার টিমকে আমার স্কুল টিম প্রায় সকল খেলায় পরাজিত করল। অফিসার্স ক্লাবের টাকার অভাব ছিল না। খেলোয়াড়দের বাইরে থেকে আনত। সবই নামকরা খেলোয়াড়। বৎসরের শেষ খেলায় আব্বার টিমের সাথে আমার টিমের পাঁচ দিন ড্র হয়। আমরা তো ছাত্র; এগারজনই রোজ খেলতাম, আর অফিসার্স ক্লাব নতুন নতুন প্লেয়ার আনত। আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলা্ম। আব্বা বললেন, “কাল সকালেই খেলতে হবে। বাইরের খেলোয়াড়দের আর রাখা যাবে না, অনেক খরচ।” আমি বললাম, “আগামীকাল সকালে আমরা খেলতে পারব না, আমাদের পরীক্ষা।”

গোপালগঞ্জ ফুটবল ক্লাবের সেক্রেটারি একবার আমার আব্বার কাছে আর একবার আমার কাছে কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করে বললেন, “তোমাদের বাপ ব্যাটার ব্যাপার, আমি বাবা আর হাঁটতে পারি না।” 

আমাদের হেডমাস্টার তখন ছিলেন বাবু রসরঞ্জন সেনগুপ্ত। আমাকে তিনি প্রাইভেটও পড়াতেন। আব্বা হেডমাস্টার বাবুকে খবর দিয়ে আনলেন। আমি আমার দলবল নিয়ে এক গোলপোস্টে আর আব্বা তার দলবল নিয়ে অন্য গোলপোস্টে। হেডমাস্টার বাবু বললেন, “মুজিব, তোমার বাবার কাছে হার মান। আগামীকাল সকালে খেল, তাদের অসুবিধা হবে।” 

আমি বললাম “স্যার, আমাদের সকলেই ক্লান্ত, এগারজনই সারাবছর খেলেছি। সকলের পায়ে ব্যথা, দুই-চার দিন বিশ্রাম দরকার। নতুবা হেরে যাব।” এ বছর তো একটা খেলায়ও আমরা হারি নাই, আর ‘এ জেড খান শিল্ডের’ এই শেষ ফাইনাল খেলা।

এ.জেড. খান এসডিও ছিলেন, গোপালগঞ্জেই মারা যান। তাঁর ছেলেদের মধ্যে আমির ও আহমদ আমার বাল্যবন্ধু ও সাথী। আমির ও আমি খুব বন্ধু ছিলাম। আমিরুজ্জামান খান এখন রেডিও পাকিস্তানে চাকরি করেন। ওর বাবা মারা যাবার পরে যখন গোপালগঞ্জ থেকে চলে আসে তখন ওর জন্য আমি খুব আঘাত পেয়েছিলাম। হেডমাস্টার বাবুর কথা মানতে হল। পরের দিন সকালে খেলা হল। আমার টিম আব্বার টিমের কাছে এক গোলে পরাজিত হল।