বাসের আগের ভাড়া কি যৌক্তিক ছিলো?

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২০ |

রুহিন হোসেন প্রিন্স ■

আসুন একটু হিসাব মিলাই। বাস ভাড়া বৃদ্ধি করার সময় অনেক যুক্তির মধ্যে বলা হতো, তেলের দাম বেড়েছে। নিশ্চয়ই একথা আপনাদের সবার মনে আছে। এটি তো বৃদ্ধির সময়ের কথা বললাম। (এখনতো বিশ্ব বাজারে তেলের দাম একেবারেই কম)। কিন্তু সাধারণভাবে যখন বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয় তখন আমাদের জানামতে, যেসব হিসাব করে ভাড়া ঠিক করা হয় তার মধ্যে একটি হলো বাসে যত সেট আছে তার ২০ ভাগ খালি থাকবে। বাসের খরচ হিসাব করতে যেয়ে বলা হয়, বড় বাসের দুটি দরজা থাকবে। ড্রাইভার, কন্টাকটার ও হেলপার মিলিয়ে ৪/৫ জন কর্মচারী থাকবে। তাদের বেতন বোনাস হিসাব করা হয়। হিসাব করা হয় প্রতিদিন এই বাসটি যে গ্যারেজে রাখা হবে তার মাসিক ভাড়া কতো। হিসাব করা হয় এইবাস নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ঠিক রাখতে, তেল মবিল পাল্টাতে, সংস্কার করতে খরচের হিসাব করা হয়। নিয়মিত বাসের রং করার খরচও হিসাব করা হয়। বাস কতদিন চলতে পারে সে হিসেবও করা হয়। এসব হিসাব করেই বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এবার হিসাব মিলান তো, ঢাকা শহরে বা বিভিন্ন জায়গায় এসবের কোনটি যথাযথভাবে মেনে বাস পরিচালনা করা হয়? সহজ উত্তর, কোনোটিই নয়। বাসে কি সিটি খালি থাকে? বাস কি নিয়মিত রং করা হয়? বাস তো রাতে সড়কের ৫ শতাংশ জায়গা দখল করে থাকে। কোথায় গ্যারেজের খরচ? আর ড্রাইভার হেলপার কয়জন থাকে? মেয়াদ উত্তীর্ণ লক্কড় ঝক্কড় মার্কা বাস চলে কেন? তারপরও নির্ধারিত ভাড়া যে, অনির্ধারিত হয়ে যায়, সেটি তো সকালেই জানেন।

তার মানে এই বাস ভাড়া নির্ধারণ করে চলাচলের নামে মালিকরা এতোদিন ধরে যে লুটপাট করে এসেছে, মানুষের পকেট হাতিয়ে যে টাকা নিয়েছে, এই মালিকরা জাতীয় দুর্যোগের সময় ন্যূনতম মানবতা দেখানোর চিন্তা করলো না । হ্যাঁ, তারা দাবি করতে পারতো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম। চলাচলের জন্য যেসব গণপরিবহন ব্যবহৃত হবে সেসব পরিবারের জন্য তেলের দাম কমিয়ে দেয়া হোক। তারা প্রয়োজনে সরকারের কাছে অন্য যৌক্তিক দাবি করতে পারত ।বাস চালাতে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানাতে পারত। কিন্তু সেটি না করে ভুল অংকের হিসাব দেখিয়ে, তারা ৮০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির কথা বললো। সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনগণের টাকায় চলে এই বিআরটিএ, শুনলাম তারাও নাকি এটি সুপারিশ করেছে। তার মানে তারা জনগণের স্বার্থ দেখল না, দেখল মালিকদের স্বার্থ। একটু হিসাব করে দেখুন তো, গণপরিবহনে যারা চলাচল করে তারা সাধারণ মানুষ। এই দীর্ঘ ছুটির সময় যাদের কাজ ছিল না। আয় ছিল না। তারা বাধ্য হয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য বা প্রতিদিন কাজ খুঁজে পাওয়ার জন্যই এই গণপরিবহন ব্যবহার করবে।

সরকার তো একটা পথ খুঁজে বের করতে পারতো এসব মানুষের জন্য, যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে আরো কম ভাড়ায় কীভাবে গণপরিবহনের চলাচল করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে। এটি নজরে এলো না। যদি গণমানুষের স্বার্থের কথা সরকার চিন্তা করতো তাহলে এই কাজটি করতো। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকার গণমানুষের স্বার্থ রক্ষা না করে যে গণবিরোধী ভ‚মিকা পালন করেছে। তার জন্য উপকৃত হবে এই লুটেরা মালিকরা। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে মালিক শ্রমিক ভাই ভাই এই  গান তুলে, প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে মালিকরা। মালিক-শ্রমিক নামে তারা বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা তুলে শত শত কোটি টাকা তুলে হাতিয়ে নিয়েছে। কল্যাণ ফান্ডের কথা বলে অথচ আমরা দেখলাম এবারের দুর্যোগে পরিবহন শ্রমিকদের জন্য স্লোগান এই ফান্ডের দেখা মিললো না। এই যে গণপরিবহনে ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হোক। তেলের দাম কমিয়ে দেয়া হোক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে, বাস জিবাণু মুক্ত করে যে কয়জন মানুষকে বাসে নেওয়া সম্ভব ওই কয়জন মানুষের উঠানোর নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হোক। এছাড়া কোনো বিশেষ সুযোগের দাবি পরিবহন মালিকদের থাকলে, তা যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করা হোক। কিন্তু কোনভাবেই এই বাস ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহন যোগ্য হবে না। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যার যার অবস্থান থেকে নানা ভাবে সোচ্চার হোন। প্রায় পকেট খালি সাধারণ মানুষের পকেট নিংড়ে নেওয়ার এই অনৈতিক, অযৌক্তিক, গণবিরোধী সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করবো না।

লেখক: সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)